বুঝে শুনে কথা বলা উচিৎ

কিছুদিন আগে দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত জনাব মোস্তফা জব্বারের লিখা “কম্পিউটারে বাংলা ভাষা প্রচলেনের নামে বাংলা বর্ণমালা বিকৃতির প্রয়াস – অবাস্তব প্রস্তাব প্রতিহত করুন” পড়ে আমার মনেহলো আমার কিছু বলা উচিত। প্রধমেই দৈনিক জনকন্ঠকে ধিক্কার দেয়া উচিত যে তাঁরা দিন-দিন নিজেদের একটি নোংরা পত্রিকা হিসেবে প্রমান করে চলেছে এবং আমার বিশ্বাস যে কোনদিন জনাব জব্বার যদি কাউকে গালি দিয়ে বেজন্মা জাতীয় কোন শব্দ ব্যবহার করে কিছু লিখেন, সেটা জনকন্ঠে সেন্সার না করেই ছাপানো হবে। আমি এই লেখার বাজে ভাষা পড়ে তো তাই বুঝলাম এবং আরও বুঝলাম যে কেন এই পত্রিকার জনপ্রিয়তা দিন-দিন কমে গিয়েছে।


আমি জনাব জব্বারের মত কলামিষ্ট নই যে বড় বড় কথা বলে বিশাল একটা কলাম লিখে ফেলব। আমি একজন সামান্য কম্পিউটার ব্যবহারকারী, এবং সেজন্যই জনাব জব্বারের লিখা কলামটি পড়ে মনহলো কিছু কথা না বললেই নয়।

জব্বার সাহেব একখানে তাচ্ছিল্য করেছেন যে একুশ শতকে পা দেবার জন্য ভাষার পরিবর্তনের প্রস্তাব মেনে নেয়া যাবেনা। আমি উনার অবগতির জন্য বলতে চাই যে আজ থেকে মাত্র কয়েক বছর আগে চাইনিজ ভাষা খাড়াভাবে লেখা হতো। কিন্তু কম্পিউটারের প্রয়োজনে আজকে সেটা আড়াআড়িভাবে লেখা হয়ে থাকে এবং চীনের মানুষ খুব সহজভাবে সেটা গ্রহন করে নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার মত দেশ কম্পিউটারে ব্যবহারে সমস্যা হতে পারে দেখে তাঁদের স্ক্রিপ্টের (ভাষার) প্রাচীন অক্ষরগুলি বাদ দিয়ে এখন ল্যাটিন স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করছে। এবং সমস্থ ইন্দোনেশিয়াতে এখন কিছু লিখবার জন্য ইংরেজী অক্ষর ব্যবহার হয়। আমার মনেহয় জব্বার সাহেব যেহেতু বাংলা ভাষার ছাত্র, এই বিষয়ে উনার জ্ঞান নেই, ইতিহাসের ছাত্র হলে এই জ্ঞান পেতেন উনি (সম্ভবত)।

আমি সম্পুর্ণ কলামটি পড়ে বুঝলাম যে উনি আসলে কোনকিছুর বিরুদ্ধে কিছু লিখেননি। কেউ বাজে ভাবে ভাষার পরিবর্তন করতে চাচ্ছে, শুনলে আমারও খারাপ লাগবে, আমিও প্রতিবাদ করব এবং আমার মনেহয় ১৩ কোটি বাঙ্গালীই প্রতিবাদ করবে, কিন্তু তাঁদের মধ্যে ১৩ জনও নিজের পণ্যের প্রচারনা করবে না প্রতিবাদের কাঁধে বন্দুক রেখে, জব্বার সাহেব যেই ভূলটি করেছেন।

আমি এবার জব্বার সাহেব সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কিছু অনুভুতি প্রকাশ করব। বাংলাদেশে কম্পিউটার ব্যবহারের জন্মলগ্ন থেকে জব্বার সাহেব কম্পিউটার ব্যবসার সাথে জড়িত। সেইসময় ভারতের ISSCI-এর ব্যবহার প্রণালী বা নিয়ম চুরি করে এবং লাইনোটাইপের ফন্ট চুরি করে অনেক কাঠ খড়ি পুঁড়ে উনি তৈরী করান বিজয় এবং লাইনোটাইপের ফন্টটি চুরি করে উনি সুতুন্নী নাম দিয়ে বাজারজাত করেন। ব্যবসা ভালই চলছিল এপ্যাল কম্পিউটারে বাংলা টাইপের সমাধান দিয়ে, কিন্তু মাইক্রোসফ্‌ট উইন্ডোজ ছাড়ার পরপরেই অনেক ডেভলপার বাংলা সফ্‌টওয়্যার তৈরী করেন একই নিয়মে এবং একই ফন্ট চুরি করে, কিন্তু সেটা উনার সহ্য হয়না। তাই সবখানেই উনি বলেন যে উনার ফন্ট অন্যরা চুরি করেছে বা কপি করেছে। উনার এরকম করার একমাত্র কারন হচ্ছে উনার পণ্যের ব্যবহার কমে যাবার ভয়, এছাড়া আর কিছুই নয়। বিজয় বিক্রি আর আনন্দ মাল্টিমিডিয়া নামের একটা প্রতিষ্ঠান চালানো ছাড়া জব্বার সাহেব আর তেমন কিছু করেন বলে আমার জানা নেই। তাই উনার পণ্যের ব্যবহার বা চাহিদা কমে গেলে উনার ভাত মারা যাবে এই ভয়েই উনি এরকম করেন বলে আমার ধারণা।

আমি প্রচন্ড জোর দিয়ে এটা বলছি এই কারনে যে যখনই কোন বাংলা সফ্‌টওয়্যার বা বাংলা কম্পিউটিং এর সমাধান নিয়ে কথা বলা হয়েছে, তখনই উনি সেটা বিরোধিতা করেছেন। প্রথমে ফ্রি সফ্‌টওয়্যার হিসেবে বাজারে এলো একুশে, সেখানে উনার সমস্যা, পরে বাজারে এলো ইউনিকোডভিত্তিক সমাধান নিয়ে অভ্র, সেখানেও উনার সমস্যা। কিছুদিন আগে এলো অক্ষরবাংলা সেখানেও উনার সমস্যা। এছাড়া প্রশিকা, আল্পনা, এগুলো তালিকাতে আছেই।

প্রথমেই উনি ডেভলপারদের আক্রমন করেন, যে কেন উনার বিজয় সফ্‌টওয়্যারে ব্যবহৃত লে-আউট অন্যরা ব্যবহার করবে। এখানে বলা উচিত্‍‌ যে লে-আউট কারও সম্পত্তি না, এটা একটা ব্যবহারের স্টেন্ডার্ড, আর পৃথিবীর কোন আইনানুযায়ী আপনি একটা ব্যবহারের স্টেন্ডার্ড উপর কোনরকম নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেননা। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে বুঝবেন। আমরা শরীরের উপরের অংশে শার্ট পরি আর নীচের অংশে প্যান্ট। আপনি আইন করে প্যান্টকে উপরে আর শার্টকে কি নীচে পরাতে পারবেন? না যে শার্ট আর প্যান্ট বানিয়েছিল সে কেস করে এটা বদলাতে পারবে? ডেভলপাররা তাঁদের লে-আউটের ১৯-২০ পরিবর্তন করে পার পেয়ে গেলে তখন জব্বার সাহেব আক্রমণ করেন ফন্ট নিয়ে। ঠিক উনি এমনটি করতেন যদি শার্ট আর প্যান্ট উনি আবিষ্কার করতেন।

বাজারের সমস্ত বাংলা সফ্‌টওয়্যারকে উনি আক্রমন করেছেন এই বলে যে সেসব সফ্‌টওয়্যারে উনার ফন্ট ব্যবহার করা হয়েছে নাম পরিবর্তন করে। কিন্তু একটা ব্যপার উনি চেপে যান যে আসল ফন্টটি উনি মেরে দিয়েছিলেন কোথা থেকে। একজন ফন্ট ডিজাইনার/ডেভলপার হিসেবে আমিও ব্যক্তিগতভাবে এই আক্রমন থেকে রক্ষা পাইনি। কিন্তু আমাদের মধ্য থেকে যদি কেউ আসলেই উনার ফন্ট নকল করে থাকেন তাহলে এখানে মাইক্রসফ্‌টের টাইপোগ্রাফি বিভাগের প্রধান, জনাব পল নেলসনের একটা কথা উল্লেখ করতেই হয়: Copyright is based on digital data, and not solely on the look. The look of the one font may be similar to some other fonts. Look at the selection of fonts on the market and you will see many are similar in style to each other. By comparing the letter shapes of the font we can determine just how close the font is to the one you are asserting is copied. These are very grave claims that we take very seriously and check the digital data. এতে করে আমি অন্তত এটা বুঝি যে লাইনোটাইপের যে ফন্টটা আমরা সবাই কপি করে চালাচ্ছি, সেটার জন্য খোদ লাইনোটাইপ আমাদেরকে থামাতে পারবেনা যদি আমরা সেটার আভ্যন্তরীন ডাটার পরিবর্তন করে থাকি। আর জব্বার সাহেবতো দূরের কথা।

প্রথমবারের মত যখন উইনিকোড বাংলা ভাষাকে যোগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখনও কিন্তু জব্বার সাহেব আজে বাজে কথা বলেছিলেন। আমার যেগুলি মনেপড়ে সেগুলি হলো: (১) এটা আসল বাংলা নয়, এটা আসামি বাংলা (যেহেতু এখানে আসামের দু’টি অক্ষর আছে); (২) এই বাংলা চলবেনা, এখানে খন্ড-ত কই ইত্যাদী।

আবার আজকে উনিই ইউনিকোড সমর্থিত সফ্‌টওয়্যার হিসেবে উনার পণ্য বিজয় একুশ-এর প্রচারণা করে যাচ্ছেন। উনার কি এতটুকু লজ্জা নেই? উনি কি মনেকরেন আমরা কিছু মনে রাখিনা? না উনি আমাদের দেশের নেতাদের মত আমাদের যা ইচ্ছা তাই শেখাতে চাইছেন? (জব্বার সাহেব নেতা হয়ে গেলেন নাকি)। আজকে ইউনিকোডের সাথে খন্ড-ত নিয়ে এত যুদ্ধ হয়ে গেলো, উনি তখন কোথায় ছিলেন? আজকে য-ফলা নিয়ে যুদ্ধ চলছে, উনি কি জানেন? উনি কি আদৌ বলতে পারবেন যে খন্ড-ত দেবার জন্য ইউনিকোড কত নম্বর ঘর ঠিক করে রেখেছে? PR-30 বা PR-37 কি এবং কেন, এই বিষয়ে কোন জ্ঞান আছে তাঁর?

কেউ যদি ভুল করেও বিজয় একুশ ব্যবহার করেন, তাহলে শুরু থেকেই সমস্যায় থাকবে। উইনিকোড যে নিয়ম অনুসরণ করে সেটা হচ্ছে ফোনেটিক বা উচ্চারণ ভিত্তিক। একটা শব্দে অক্ষরগুলি যেভাবে উচ্চারিত হয়, আপনকে সেভাবেই লিখতে হবে। মানে আমরা যদি বলি কবে, তাহলে সেটা বলছি ক-ব-এ এবং আপনাকে লিখতে হবে ক+ব+ে = কবে এর বেশী কিছু নয়। এতদিন জব্বার সাহেবের টাইপিং নিয়মানুযায়ী আমরা লিখে এসেছি ক+ে+ব, তাহলে কি আমরা বলি ক-এ-ব? বড়ই হাস্যকর। আপনি যদি জব্বার সাহেবরে নিয়ম কিছুক্ষণ হলেও মেনে নেন, তাহলে একটু চিন্তা করে দেখুন যে আপনাকে বাংলা লিখতে কত কষ্ট করতে হবে। প্রথমে চিন্তা করবেন কি লিখবেন। তারপরে লিখার আগে সেটা মনে মনে সাজাবেন এবং পরে টাইপ করবেন। কারণ কোনটা আগে কোনটা পরে আপনাকে মনে মনে সাজাতে হবে, কম্পিউটার আপনাকে সাজিয়ে দেবেনা। আমরা কম্পিউটার ব্যবহার করছি, টাইপ মেশিন না। আর সারা বিশ্বের কম্পিউটারে এভাবেই সমস্ত ভাষা লেখা হয়। মানুষের এত চিন্তা করবার সময় নাই। স্বাভাবিক ভাবে দেখলেও দেখা যায় যে আমরা স্কুলের বাচ্চাদের বানান শেখাতে গেলে ফোনেটিক্ বা উচ্চারনভিত্তিক ভাবেই শেখাই। আমরা বলিনা কো লিখবে এ-কার ক আ-কার দিয়ে। আমরা সরাসরি শেখাই ক ওকার এবং তাঁরা শেখেও তাই। সুতরাং বোঝা যায় যে বিজয় সফ্টওয়্যারের পুরাতন নিয়মটা কতটা অস্বাভাবিক।

মাইক্রোসফ্‌ট উইন্ডোজে বাংলা সাপোর্ট দেয়া হয়েছে, সেটা নিয়েও উনার সমস্যা। কারন সেটা প্রচারিত হয়ে গেলে উনার পণ্য আর বিক্রি হবেনা। মানুষ এমনি বাংলা লিখতে পারলে আর সফ্‌টওয়্যারের প্রতি অনুগত থাকার প্রয়োজন হবেনা, আর উনি ব্যবসা করতে পারবেননা। তাই উনি ফোনেটিক টাইপিং এর বিরুদ্ধে হাতিয়ার নিয়ে বসেছেন, যে যদি আর কিছুদিন ব্যাবসা করে নেয়া যায়। বিজয় একুশ ব্যবহার করলে সুবিধার চাইতে সমস্যাই হবে বেশী। একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। আমার কম্পিউটার UTF-8 লেয়ারের মাধ্যমে ইউনিকোডের সাহায্যে বিশ্বমানের বাংলা’র সমর্থন আছে। আমাকে যদি কেউ বিজয় একুশ ব্যবহার করে বাংলায় ইমেইল পাঠায়, তাহলে আমি সেটা পড়তে পারবনা। শুধু আমি না, সারা বিশ্বের বাংলা ব্যবহারকারী কেউই পড়তে পারবেনা।

জব্বার সাহেব আমার বাবার সমবয়সী একজন মানুষ। অবশ্যই উনার প্রতি আমার যথেষ্ট সন্মান আছে। কিন্তু উনি বিভিন্নভাবে অন্যদের ছোট করে উনার পণ্যের প্রচার করতে চাইবেন, সেটা আমি মানতে রাজি না। আমার বিশ্বাস কেউ এটা মেনে নেবেনা। উনি চাইছেন কম্পিউটারে বাংলার ব্যবহারের রাজা হয়ে থাকতে, হ্যাঁ আজ থেকে ১০ বছর আগেও সেটা সম্ভব ছিল, কিন্তু এখন সেটা সম্ভব না। এখন প্রযুক্তি সবার হাতে হাতে।

আমার এতদিন বিজয় ব্যবহার করেছি। উপায় ছিলনা বলেই করেছি। কিন্তু এখন যখন সারাবিশ্বের সমাধান আমাদের পয়ের কাছে, আমরা কেন উনাকে তেল দিতে যাব! হ্যাঁ আমরা উনাকে সন্মান করব, কারন উনিই প্রথম আমাদেরকে কম্পিউটারে বাংলা দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল।

পাশাপাশি কিভাবে ভুলে যাব যে এই বিজয়ের বাংলা দেখেই ডাকা হয়েছিল ভোটার আইডি-এর মত প্রজেক্ট। কাজ না হওয়ায় নষ্ট হয়েছিল কোটি কোটি টাকা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। আর এরকম করলেতো চলবেনা। আমাদের সকলকে সোচ্চার হতেহবে এবং সস্তা কথায় কান দিলে চলবেনা। সারাবিশ্ব যেই নিয়ম অনুসরণ করবে, আমরাও তাই করব। এক্ষেত্রে জব্বার সাহেবের ব্যবসা নষ্ট হলে আমাদেরতো কিছু করার থাকবেনা। এখন উনার ব্যাবসার চাইতে সন্মান রক্ষা করা নিয়ে বেশী ভাবা উচিত।

মন্তব্য করুন